আমাদের দুর্গাপুজো নিছক কোনো শারদীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়; এ হলো দেশকাল পেরিয়ে আসা এক পরিবারের অস্তিত্ব রক্ষা, আত্মমর্যাদা এবং শিকড়কে ভালোবেসে বাঁচিয়ে রাখার এক অবিস্মরণীয় মহাকাব্য। বাংলার বনেদি পুজোর ঐতিহ্যের সাথে মিশে আছে এর আভিজাত্য, কিন্তু এর মূল ভিত্তিপ্রস্তরটি স্থাপিত হয়েছিল দেশভাগের তীব্র যন্ত্রণা আর এক অনিশ্চিত নতুন যাত্রার ওপর।
১৯৫১ সালে চেনা চট্টগ্রাম, মায়াভরা বাস্তুভিটা এবং বহু প্রজন্মের আত্মীয়তার বন্ধন একমুহূর্তে পেছনে ফেলে কলকাতার অচেনা মাটিতে পা রেখেছিল আমাদের পরিবার। সেই উত্তাল ও সংঘাতময় দিনগুলোতে বাস্তুহারা মানুষের সামনে বেঁচে থাকাটাই ছিল চরম পরীক্ষা। কিন্তু ভৌগোলিক সীমানা বদলে গেলেও মানুষের রক্তের ভেতর জমে থাকা সংস্কার আর সংস্কৃতিকে তো মুছে ফেলা যায় না! শূন্য থেকে শুরু হওয়া সেই কঠিন জীবনসংগ্রামের ভেতরেও পরিবারটি সযত্নে আগলে রেখেছিল নিজের অন্তরের আলো—যার প্রাণভোমরা হয়ে উঠল দেবী দুর্গার আরাধনা।
কলকাতার নতুন ঠিকানায় এই দুর্গাপুজোই হয়ে দাঁড়াল এক সেতু—যা অতীতের ফেলে আসা ভিটেমাটির সাথে বর্তমানের বাস্তবতাকে একসূত্রে বেঁধে রাখে। ঢাকের বোলে আর ধূপের গন্ধে পরিবারের প্রতিটি মানুষ আজও ফিরে পায় নিজেদের চেনা শিকড়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই উৎসব আমাদের শিখিয়েছে কীভাবে একতাবদ্ধ থাকতে হয়, কীভাবে প্রতিকূলতার মুখে মাথা তুলে দাঁড়াতে হয়।
আমাদের এই শারদোৎসবে মিশে থাকে অদ্ভুত এক দ্বৈত সুর—একদিকে ভিটে হারানোর এক নিঃশব্দ শূন্যতা, অন্যদিকে নতুন মাটিতে শাখা-প্রশাখা মেলে দাঁড়িয়ে থাকার এক বুকভরা অহংকার। দেবী দুর্গার দশ হাতে যেন প্রতিফলিত হয় সেই পরিবারেরই ঘুরে দাঁড়ানোর অদম্য শক্তি।
সময়ের ধুলোয় কত ইতিহাস ফিকে হয়ে যায়, কিন্তু আমাদের পূর্বপুরুষদের রেখে যাওয়া এই আত্মপরিচয়ের মশাল আজও একইভাবে প্রোজ্জ্বল। আমাদের দুর্গাপুজো তাই শুধু দেবী আবাহন নয়—এ হলো স্মৃতির শিকড়কে ছুঁয়ে থাকা, ঐতিহ্যের গর্বকে উদযাপন করা এবং আগামী প্রজন্মের কাছে নিজেদের প্রকৃত শিকড়ের পরিচয় সগৌরবে তুলে ধরার এক পবিত্র অঙ্গীকার।

